পাড়ার পুজোমন্ডপের মা দুর্গার বিসর্জনের পরদিন বিজয়া সম্মেলন হল, আমারও সেখানে যাবার কথা(এখানকার কথা নয়, বছর আড়াই আগে যেখানে ছিলাম)। অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেছে, তাই তাড়াহুড়ো করছি, কিন্তু রওনা হতেই পা আটকে গেল—-
মাইকে ঘোষনা হচ্ছে মহিলাকন্ঠে, ” —-এটা রবীন্দ্রসঙ্গীতের একটা ‘রিমিক’, অমুক সিনেমায় গাওয়া, গেয়েছেন অমুক-তমুকে, অমুক চ্যানেলের ডান্সের কম্পিটিশনে আমার এই ছাত্রী এই নৃত্যই প্রদর্শন করেছিল, ইত্যাদি-”।
চমৎকৃত হলাম! সৌভাগ্যান্বিতও হলাম! কিন্তু কি শুনলাম ?
ঘোষিকা কি ‘রিমিক্স’ বলতে চেয়েছিলেন ? হবে হয়ত। তবে এমন কিছু হলে, শেষ পর্যন্ত নানা ধরনের গানের সাথে সাথে রবীন্দ্রসঙ্গীতেও রিমিক্স হল নাকি !হলে অবশ্য এটা নিঃসন্দেহে একটি ‘পাওয়া’ । আর ‘রিমিক’ যদি ‘রিমেক’ হয় তাহলে কোন অসুবিধা নেই, কেননা রবীন্দ্রসংগীত রিমেকই হয়, নতুন শিল্পীর নতুন গাওয়া রবীন্দ্রনাথের গান আর কবে হয় ? নতুন গান কদাচিৎ শোনা যায়।
দীর্ঘদিন থেকেই শুনছি, আর এবারে ২৫শে বৈশাখেও বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে শুনলাম নানা কথা। একজন নবীন শিল্পী বললেন তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীতের ‘ফিউশন’ গেয়েছেন সিডিতে। আর কারও কারও কথায় এই গানে ‘রয়েছে যান্ত্রিক অনুষঙ্গ পরিবর্তনের, পরীক্ষা-নিরিক্ষা বা সময়োপযোগী করার সুযোগ’।
বোধ-বুদ্ধি কম বলেই কিনা জানি না, এই কথাগুলোর অর্থ সব মাথার ওপর দিয়েই বেরিয়ে গেল। কেননা, কবিগুরুর মত কবির করা কিছু কাজের ওপর পরীক্ষা-নিরিক্ষা করা বা পরিবর্তন করে সময়োপযোগী করা যায় ? এটা জেনেবুঝে হজম করাই মুশকিল !
এবং তৎক্ষনাৎ-ই মনে হল, তাহলে শুধু এই গানই কেন, যাবতীয় রাগ-সঙ্গীত-সহ আরও অনেক ‘ক্লাসিক’ হয়ে যাওয়া গান, যা অতি প্রাচিন হয়ে গেছে– সেসব নিয়েও ত এমন ভাবা যেতে পারে, যেমন বিখ্যাত উচ্চাঙ্গের গান ‘ক্যা করুঁ সজ্‌নী,আয়ে না বালম’ ( কথাগুলোর বানান সঠিক না হতেও পারে, ক্ষমা প্রার্থনীয় )। এটাও সময়োপযোগী যন্ত্রানুষঙ্গে গাওয়া যেতে পারে! দারুণ সুন্দর ‘রিমিক’ হবে!
বেহাগ, কি দেশ বা অন্য যে কোন রাগে খেয়াল গানও ওই একই ভাবে গাওয়া যেতে পারে! রবীন্দ্রসঙ্গীত যদি হতে পারে তাহলে এসব গানও বেশ জম্পেশ হবে! কোন ঠুংরি ত আরও ভাল চলবে। আরও কত রয়েছে এমন সব গান, যেমন, গজল, গীত, টপ্পা, পুরাতনী, অতুল প্রসাদ,নজরুলগীতি, রজনীকান্ত, দ্বিজেন্দ্রগীতি, রামপ্রসাদী,কীর্তন(এ সবই বেশ পুরোন), নিদেনপক্ষে সলিল চৌধুরীর সুর করা গান ইত্যাদি! তরুণ শিল্পীরা প্রয়াস করতে পারেন!
সলিল বাবুর করা সুর তত প্রাচিন না হলেও এক সময় ত পুরোন হবেই, তাই আগে-ভাগে নতুন করে সময়োপযোগী করে সেরে ফেলাটাই ভাল মনে হয়! যদি ইতিমধ্যেই কেউ এই মৌলিক চিন্তাটা করে ফেলে, তখন? কোন উচ্চাকাংখীর ক্ষেত্রে সুযোগটা হাতছাড়া হয়ে যাবে না ?
তাই বলছিলাম আর কি—!
তার পরেও অবশ্য পরীক্ষা-নিরিক্ষা বা সময়োপযোগী করার সুযোগ থাকছেই !