হোস্টেল, রবিঠাকুর আর অক্ষয়কুমার

ক্যাপাচিনো কিছুদিন আগে বলছিল হোস্টেলের গল্প কেন লিখছি না আর। সময় হয়ে উঠছে না কফিহাউজে নিয়মিত আসার, লেখার। তার মধ্যে আজকে আবার ২৫শে বৈশাখ। নিজেকে বিদগ্ধ বাঙালি প্রমাণ করতে গেলে আবার আজকের দিনে কবিগুরুকে নিয়ে দু-চার কথা বলতেই হয়। তা সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই অনেক দিন আগের এক ২৫শে বৈশাখ মনে পড়ে গেল। সেই গল্পই আজকে। যা একাধারে হোস্টেলের গপ্পোও।

সাল ১৯৯৪। কলেজে প্রথম বছর। থাকি হেদুয়াপাড়ার হোস্টেলে। কাছেই জোড়াসাঁকো। কাজে কাজে প্রবল উৎসাহে, যা এতদিন খালি টিভিতে দেখে এসেছি, সেই বিখ্যাত অনুষ্ঠান সশরীরে দেখার সুযোগ কে ছাড়ে। রুমমেট ছিল বেশ কয়েকজন রবীন্দ্রভারতীর ছাত্রী। তাদের সাথে দল বেঁধে সাতসকালে সাজুগুজু করে হেঁটে চলে গেলাম জোড়াসাঁকো।গিয়ে দেখি ভীড়,ভীড়। ম্যারাপ বাঁধা লম্বা সামিয়ানা, তার এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে আমরা, অন্য প্রান্তে স্টেজ। সেখানে পর পর বুড়ো বুড়ো শিল্পীরা উঠছেন, গান গাইছেন, আবৃত্তি করছেন, নেমে যাচ্ছেন। নাচ-টাচ কিছু হচ্ছে না। সামিয়ানার তলায় বৈশাখের গরমে ঘামছি। প্রথমে তো অনেক্ষণ দাঁড়িয়েই অনুষ্ঠান দেখলাম। ঘন্টা দুই-তিনেক পরে, বেলা বাড়লে, ভীড় একটু কমল, তখব চেয়ার পেলাম । (সে-ই-ই হারিয়ে যাওয়া কাঠের ফোল্ডিং চেয়ার)। গরমে বেশ কষ্ট হচ্ছে, খিদেও পেয়ে গেছে, কিন্তু ‘সংস্কৃতিপ্রেমী’ ট্যাগটা খুব জরুরী, তাই উঠেও আসতে পারছি না। অনুষ্ঠান বেশ এক ঘেয়ে লাগছে। তবে হ্যাঁ, এখনো একজন কে মনে আছে। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। বেলার দিকে এলেন, লাল টকটকে পাঞ্জাবী পরে, উদাত্ত গলায় আবৃত্তি করলেন, চলে গেলেন। অনেকটা ভিনি ভিডি ভিসি গোছের ব্যাপার। ওই লাল পাঞ্জাবীটাই মনে থাকার মূল কারণ।
বেলা সাড়ে বারোটা নাগাদ হোস্টেলে ফিরে গপাগপ ভাত খেলাম। তার পরেই জানতে পারলাম, তিন চার জন সিনিয়র দিদি হাতিবাগানে সিনেমা দেখতে যাচ্ছে। সেই সময়ে হাতিবাগান ছিল এক সুখের স্বর্গ। সেই নিয়ে আরেকদিন লিখব।দেখলাম ছুটির দুপুর। সকালটাও ঠিক মনমত হয়নি। এবেলাটা অন্তত একটু ঠিকঠাক কাটুক। সকালের দলের মধ্যে আমি আর আরেক বন্ধু (এইমাত্র বুঝতে পারলাম, স্মৃতি ক্ষীণ হয়ে আসছে, আরেকজন যে কে, সেটা দুজন বন্ধুর মধ্যে গুলিয়ে ফেলছি ) —আমরা দুইজন আরো জনা তিনেকের সাথে চলে গেলাম হাতিবাগান। অক্ষয়কুমার-সইফ আলি খানের ‘ইয়ে দিল্লগী’ দেখতে। ছুটির দিনে সিনেমা হল গুলি সব জমজমাট। ব্ল্যাকে টিকিট কাটলাম । সিট পাওয়া গেল একদম প্রথম সারিতে। ঘাড় উঁচু করে দেখতে দেখতে ঘাড় ব্যথা। কিন্তু অক্ষয়কুমারের চেনা ছকের বাইরে গিয়ে চশমা চোখে, রোমান্টিক বিজনেসম্যান লুক দেখে আমরা একেবারে বোল্ড আউট। ব্রেকের সময়ে বোঝা গেল আমরা পাঁচজনেই এক সাথে একই সময়ে এই অক্ষয়কুমারকে আমাদের প্রেমিক হিসাবে পেতে চাইছি। সব থেকে অবাক হয়ে গেলাম প্রেসিডেন্সিতে ফিজিক্স পড়া সাদা-মাটা-চশমা-আঁটা-মামার-কাছে-বাগদত্তা-গম্ভীর দক্ষিণী লক্ষ্মীদি কে দেখে ( আমরা ডাকতাম লক্‌ষ্‌মীদি)। সেও দেখছি আক্কির প্রেমে পাগল। যাইহোক ম্যাটিনি শো দেখে বেরিয়ে, হাতিবাগানের ট্রাম লাইনের ধারে দাঁড়িয়ে সবাই এক বাক্যে স্বীকার করলাম, এইরকম লুক এবং চরিত্র বজায় রাখলে আমরা অক্ষয় কুমারকেও বিয়ে করতে রাজি।
এইভাবে সেই বিগত বৈশাখে, একই দিনে, সকালে ‘বিশুদ্ধ বাঙালি সংস্কৃতি’ আর বিকেলে ‘জনপ্রিয় সংস্কৃতি’ দুইইয়ের অভিজ্ঞতাই সঞ্চয় করেছিলাম। ভেবে দেখতে গেলে, জনপ্রিয় সংস্কৃতিই আমাকে বেশি আনন্দ দিয়েছিল। প্রোটোকলে মোড়া জোড়াসাঁকোর অনুষ্ঠানের সাথে সেদিন নিজেকে একাত্ম করতে পারিনি।

রবীন্দ্রনাথ আজও বেশিরভাগের কাছেই পূজনীয়। তাঁর জনপ্রিয়তা কিন্তু এখনো সীমাবদ্ধ।

—————————————-
লেখাটা মনে হয় ৫০০ শব্দের সীমানা পেরিয়ে গেছে।আশাকরি অ্যাডমিন লেখাটা বাতিল করে দেবেন না। পুরো ব্যাপারটা এর কমে লেখা যাচ্ছিল না 🙂