ইউরোপ ভ্রমণ – (১)

অনেকদিন পরে আবার এলাম তোমাদের সঙ্গে আড্ডা দিতে। কাজের চাপ আর ঘুরতে যাওয়ার তাড়ায় এখানে আসা হয়নি। এত গম্ভীর আলোচনার মধ্যে, আমার ঘুরতে যাওয়ার একটু গল্প শোনাই। আমি এই Easter এর ছুটিতে গিয়েছিলাম আমস্টারডাম, ব্রাসেলস, বার্লিন আর হামবুর্গ। এই সবকটি দেশের বিশেষত্ব হল জল। শহরের বেশ কিছুটা অংশ জলপথে ঘেরা আর সেটাই দেশগুলির সৌন্দর্য।
আমস্টারডাম (অর্থাৎ হল্যান্ড বা নেদারল্যান্ডস) খুব ভাল লেগেছে। একটা বিশেষ গতি রয়েছে সেখানে। সকাল হোক বা রাত্তির সবাই জেগে – আনন্দে উন্মত্ত, কোন এক মনোরম উৎসবে যেন তাল বেতালে নেচে চলেছে। আমরাও তাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কিছুক্ষণ মত্ত হয়ে উঠলাম। বেশ লাগল। প্রথমেই চলে গেলাম Kekonhoff Garden। সেখানে লক্ষ লক্ষ টিউলিপ ফুলের মেলা। এই ফুলের বাগানটি খোলা থাকে বছরের দুটি মাস। ২১শে মার্চ থেকে মে’র মাঝামাঝি। সারা বাগান প্রচুর ফুলে ভর্তি থাকে। এবারে শীতটাও খুব পড়েছিল আর অনেকদিন ছিল বলে বাগানটা পুরোপুরি আমাদের জন্যে সেজে উঠতে পারেনি। কিন্তু তাও যেটুকু দেখেছি অসাধারণ। বাকিটা ছবিতে ও কল্পনার তুলি দিয়ে আঁকা। এত রঙ, এত সৌন্দর্য যে প্রাকৃতিক ভাবে গড়ে উঠেছে ভাবলেই কিরকম একটা লাগে। শুধু কিছুটা যত্নে তারা ফুটে উঠেছে, সাজিয়ে চলেছে আমাদের পৃথিবীটাকে। অপূর্ব রঙের মেলায় গিয়ে পৌঁছলাম। বিশাল এই প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখে ছবি তুলতে প্রায় চার ঘণ্টা লাগল। তারপর ফিরে এসেই আমরা চলে গেলাম একটি ক্যানাল ক্রুজ – মানে জলপথে শহর পরিক্রমা। বেশ লাগল সেটাও। পরপর কয়েকখানি সেতুর নিচে দিয়ে জলপথে শহরের বিশেষ বিশেষ জিনিস গুলো দেখতে দারুণ লাগছিল। তার মধ্যে সব থেকে বিখ্যাত অ্যানি ফ্রাঙ্কের বাড়ি।
এই করেই কেটে গেলো বিকেলটা। তারপরেই রাতের আলোয় আর এক নতুন অভিজ্ঞতা। হাটতে হাটতে পৌঁছে গেলাম এক বাণিজ্য নগরে। সেখানে প্রচুর বড় বড় ব্যবসায়ী, Entrepreneur বললে চলে। তারা নিজেরাই সম্পূর্ণভাবে তাদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। বেচাকেনার মূল সম্পদটা হল শরীর। এখানে না কোন দালাল, না কোন মালিক এর প্রশ্ন রয়েছে। এখানে এক একটি মহিলা, সরকারের থেকে একটা ছোট ঘর ভাড়া করে তাদের দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রদর্শন করে ব্যবসার প্রচার করে এবং সারাক্ষণ পুলিশ তাদের সুরক্ষার জন্যে ঘুরে বেড়ায়। এই জায়গাটির নাম Red Light District – এই ব্যবসা নগরী হয়ে উঠেছে টুরিস্টদের এক অন্যতম দর্শন স্থান।
পরের দিন সকালে আমরা চলে গেলাম নেদারল্যান্ডস এর গ্রাম আর উইন্ড-মিল দেখতে। ওদের গ্রাম আমাদের সল্টলেকের থেকে বেশি উন্নত। সারি সারি উইন্ড-মিল, নদী ও মাঠ পেরিয়ে দেখতে গেলাম অতি বিখ্যাত ডাচ চিজস কিভাবে তৈরি হয়। তাদের প্রাচীন এবং আধুনিক মেশিন দিয়ে গোটা সিস্টেমটা বোঝালেন সেই কারখানার কিছু কর্মী। বিভিন্ন চিজের স্বাদও নিলাম আমরা। তারপরে দেখলাম আরও এক বিশেষ জিনিস। আর এক বিখ্যাত বস্তু হল কাঠের জুতো। গেলাম সেই কারখানায়। দেখলাম কি সহজে তিনটি মেশিনের দ্বারা কাঠের জুতো তৈরি করা হয়। বিভিন্ন ধরনের কাঠের জুতোর মধ্যে আমার সব থেকে ভাল লাগল Smuggler Shoes। এই জুতোর বিশেষত্ব এই যে জুতোর নীচের আকার এমন করে বানান যে যেই দিকে ব্যক্তি হাঁটবে তার অন্য দিকে পায়ের ছাপ পড়বে। বেশ ভালো লাগল অন্যায় করে ধরা না পড়ার এই পদ্ধতি দেখে। এই সব সেরে আমরা ফিরে এলাম আবার শহরে।
দেখে নিলাম ডাম স্কয়ার এর জমজমাট ভিড় আর আড্ডা। বিশাল এক উৎসব যেন। বিশাল বিশাল নাগরদোলা এবং সাংঘাতিক কয়েকটা দোলনা । সেই সব দেখে টুকটাক খেয়ে ঢুকে গেলাম মাদাম টুস্যাডস মিউজিয়ামে। বিখ্যাত ব্যক্তিদের মোমের পুতুল এ ভরতি এই মিউসিয়াম । কি নিখুঁত কাজ , না দেখলে ভাবা যায় না । দেখে বোঝাই যাবে না, সত্যি না মিথ্যে। সব থেকে মজার ব্যপার হল , এত মোমের পুতুল দেখে, যখন কোন মানুষ কে, একটু চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখছি , তখন মনে হচ্ছে সেও যেন একটা পুতুল। সেইসব দেখে আর কিছু মিউজিয়াম দেখে শেষ করলাম হল্যান্ড ভ্রমণ। সারাদিন ঘুরে রাতে পৌঁছে গেলাম বেলজিয়ামে। কিন্তু সে গল্প আরেকদিনের জন্যে তোলা থাকল। আজ আসি। পরে আবার আমার ভ্রমণ কাহিনী শোনাব।