রবিদা’র সাথে ইডেন!

রবিদা’র সাথে ইডেন দর্শন আর আমার কেরামতি না জানালে ঠিক হবে না।
রবিদা যেমন বলেন, একদিন দুপুরে তেমনই বললেন, ‘চ, ইডেন দেখিয়ে আনি।’ নেচে উঠলাম। আবার সেই দু’আনা এবং তিন পয়সার ট্রামের গল্প! এবং গড়ের মাঠ। তবে এবার নতুন জায়গায়। আকাশবানী ভবন কি তখন হয়েছিল ? মনে নেই।
ইডেনে কোন সময় একটা স্টেডিয়াম তৈরী করা শুরু হয়েছিল। কিন্তু কিছুটা হয়ে যাবার পর সেটা কোন কারনে বন্ধ হয়ে যায়, কারনটা ‘নেট’ ঘেঁটে পেলাম না। হয়ত তেমন করে খোঁজা হয় নি ধৈর্যে কুলোয় নি বলে ! এই সামান্য তৈরী হওয়া অংশটিকে বলা হত ‘রঞ্জি স্টেডিয়াম’। এখন ত তার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া মুশকিল, গোটা মাঠ জুড়ে নতুন গ্যালারির মাঝে সেটা বোধ করি হারিয়েই গেছে! ১৯৬০-এর শুরুতে, ‘টেস্ট ম্যাচ’ দেখার জন্য সেখানে বসা দর্শকের টিকিটের আলাদা দাম ধার্য করা হত, মানে সাধারন দর্শকের জন্য কম দামের টিকিটই হত সে সব। এখনো হয় কিনা জানি না। অনেক দিন ইডেনে যাই নি!
যা-ই হোক, রবিদার সাথে চললাম ইডেনে, রঞ্জি ট্রোফির কোন খেলা চলছিল সেখানে, কিন্তু পয়সা নেই। তা’তে কি ! আগেই খুঁজে গেছিলেন নিশ্চয়ই ঘেরা মাঠে ঢোকার উপায়। সেটা দেখলাম এখন।
অনেকবার ইডেনের পাশ দিয়ে গেলেও, এখনও ভাল করে দেখা হয়নি আর জানিও না এখন কি দিয়ে মাঠটা ঘেরা আছে। সে সময় ছিল করগেটেড টিন দিয়ে।
অনেক জায়গাতেই দেখলাম দু’টো টিনের জোড়ের জায়গায় নীচের দিকে অল্প ফাঁক রয়েছে। কিছু টানাটানি করলে সেই ফাঁক বড় করা সম্ভব। সেই কাজটাই করলেন রবিদা। দুর্বল একটা জায়গায় একদম নীচের দিকে কোন মতে গলে যাওয়া যায় এমন ফোকর তৈরী হল! আমরা কোন মতে গা, জামা-কাপড় বাঁচিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে পড়লাম!বাধা দেওয়ার কেউ ছিল না! এক দৌড়ে রঞ্জি স্টেডিয়ামের কংক্রিটের সিটগুলোকে সিঁড়ির মত করে নিয়ে ধাপে ধাপে অনেকটা ওপরে উঠে পড়লাম। দিনের খেলা শেষ হলে ফিরতে ফিরতে সেই সন্ধ্যা! ফিরে কি হয়েছিল তা জানি না, মনে নেই। তবে আপ্যায়ন যে ভাল হয় নি, সেটা মনে আছে। মা-এর আঁচলের আড়ালে দু’জনকে আশ্রয় নিতে হয়েছিল!
লোভ জিনিষটা মারাত্মক ! সেটাই হল ! পরদিন খবরের কাগজ দেখে জানা গেল, ইডেনে যে খেলা হচ্ছে সেটা বাংলা বনাম সার্ভিসেসের রঞ্জি ট্রোফির খেলা, আর সার্ভিসেসের শেষের দিকের খেলোয়াড়েরা আউট হলে সেদিনই বাংলার ব্যাটিং শুরু এবং যথারীতি পংকজ রায় শুরু করবেন। সুতরাং এ সুযোগ ছাড়া যায় না। কিন্তু সঙ্গী চাই একজন,রোজ রোজ ত রবিদা যাবেন না!
তখন বোধ হয় এইটে পড়ি আর জ্যাঠতুতো ভাই এক ক্লাস নীচে পড়ে। ওকে রাজী করালাম এই বলে যে পংকজ রায়ের খেলা দেখার এমন সুযোগ আর মিলবে না!
রবিদা’র ফর্মূলা মেনে একই ভাবে ইডেনে পৌঁছে গেলাম আর যথারীতি সেই ফোঁকড়ও খুঁজে পেলাম। আর ঢুকেও গেলাম। কিন্তু ভেতরে যে গোলমাল অপেক্ষা করছিল সেটা জানতাম না। এ দিন ঢুকেই দেখি একটু দুরে দু’জন ‘লালপাগড়ি’ বসে বসে গল্প করছে! সে সময় পুলিশের কনষ্টেব্‌ল্‌রা মাথায় লাল পাগড়ি পড়ত। আর সবাই পুলিশ না বলে ‘লালপাগড়ি’ বলে সম্বোধন করত।
“এ খোঁখা”, ডাক শুনে পিলে চমকে গেলেও যেতে হল। বিনা টিকিটে ঢুকে বে-আইনি কাজ যে হয়েছে সেটা জানা। চুপচাপ কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে নানা জিজ্ঞাসাবাদের উত্তর দিতে হল। এখন বুঝি সে সব ছিল ফালতু কথাবার্তা, কিন্তু তখন ত ছোট ছিলাম। বাড়িতে শাসন ছিল খুব! ভয় পেয়ে ত’ ত’ করে একসা হলাম একেবারে! ওরা অবশ্য শেষ পর্যন্ত ধমকে ছেড়ে দিল, আর শাসিয়ে দিল যাতে ভবিষ্যতে এমন না হয়!
আমরা যখন ঢুকেছিলাম তখন পংকজ রায় ব্যাট করছিলেন। সেটা দেখলাম ঐ কংক্রিটের ষ্টেডিয়ামে বসে।
খেলা শেষ হলে বাড়ির পথে যেতে গিয়ে আর এক বিপত্তি!
রবিদা’র দেখানো জায়গা থেকেই ট্রাম ধরব। সেখানে দাঁড়াতেই দেখি একখানা ট্রাম আসছে। সেখানে যে নানা রুটের ট্রাম আসে তা ত রবিদা বলে দ্যায়নি। তাই সামনেরটাতেই উঠে পড়েছি। হঠাৎ বাজখাঁই চিৎকার, ‘কোথায় যাচ্ছিসরে তোরা ?’ চমকে উঠে দেখি সুধিরদা, পাড়ার দাদা, অফিস থেকে ফিরছেন বোধ হয়!! যেখানে বাঘের ভয় আর কি ! বাড়িতে সব জানাজানি হয়ে যাবে আজ! তারপর যা হবে, ভাবতেই গা হিম হয়ে যাচ্ছিল!
‘ও ট্রামটা কোথায় যাবে জানিস ? জীবনে বাড়ী পৌঁছতে পারবি ? আমি যেটাতে যাচ্ছি সেটায় ওঠ। বাঁদর কোথাকার, দেখাচ্ছি মজা,দাঁড়া।’ পরে অবশ্য কিছু হয়নি আর!
সেদিন সুধিরদা বাধা না দিলে কি যে হত, অজানা জায়গায় আস্তানা খুঁজতে সারা রাত কাবার হত নিশ্চয়!
আর একটা কথা। তখন বলা গেলেও, বর্তমানের নিরিখে পাড়ার সুধিরদা’রা অমনভাবে ধমকাতে পারতেন ? না কি, আগ বাড়িয়ে কিছু বলতেন ?