ইউজ অ্যান্ড —।

কয়েকদিন আগে ব্যাংকের কাজে বের হয়ে রাস্তায় গিয়ে মনে পড়ল ডট পেনটার কথা। সেটা ত আনা হয়নি ! আবার বাড়ি গিয়ে সেটা আনব কিনা ভাবতেই মনে পড়ল কি দরকার কালক্ষেপ করে, একটা ‘ইউজ অ্যান্ড থ্রো’ কিনে নিলেই ত হয়, মাত্র’ত দু’তিন টাকা দাম ! কাজ হল। কলমটা ফেলিনি, নিয়ে এসেছি বাড়িতে!
তিন টাকার কলমের কথায় চট করে মনে পড়াল ৫০/৬০ বছর আগের কথা!
তখন ডট পেন ছিল না (থাকলেও একেবারে প্রাথমিক স্তরে, মানে ধ্যাবড়া লেখা পড়ত আর সেই কলম পকেটে রাখলে জামা নষ্ট হওয়া ছিল অবধারিত!) ছিল ঝর্না কলম। কলমে কালি ভরে লেখালেখি করতে হত। কিন্তু সেটাই ছিল সেই কলমের ত্রুটি। কালি ‘লিক’ করত অহরহ! তখনকার দিনে স্কুলে কলম নিয়ে গেলে শাস্তি পেতে হত (পেন্সিল ছিল ম্যান্ডেটরি)। লুকিয়ে নিয়ে গেলেও ‘হাতে কালি, মুখে কালি’ হয়ে ধরা পড়ে যেতে হত।
কালিভরা সে সময়ের কলমের দামছিল একটাকা/দেড় টাকা। ‘রাইটার’ নামের একটা খুব চালু কলমের দাম ছিল ১ টাকা।
কালি লিক করলে ছুটতে হত ‘পেন হসপিট্যাল’-এ। হ্যাঁ, এমনই নাম ছিল এক একটা দোকানের, যেখানে সেই লিক করা কলমের মেরামতি হত।
এমন অনেক দোকান ছিল তৎকালীন কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীটে (বর্তমানে যার নাম বিধান সরনি)। হাতিবাগান থেকে শ্যামবাজারের মোড় পর্যন্ত যেতে রাস্তার বাম ফুটপাথে যত গাড়িবারান্দা ছিল, তার প্রায় সবগুলোতেই নানা ধরনের দোকানের পাশে পাশে থাকত ঐ কলম সারাইয়ের দোকান। দেওয়ালে একটা কাচে ঢাকা শোকেসের মত টাঙানো থাকত, যার প্রতি তাকে সাজানো থাকত নানা ধরনের সারাইয়ের সরঞ্জাম। দোকানদার বসতেন সামনে একখানা টুল নিয়ে, ফুটপাথের ওপর।
‘অসুস্থ’ কলম নিয়ে গেলেই পুরোদস্তুর ‘চিকিৎসা’ হয়ে স্বাভাবিক হয়ে যেত! খরচ সামান্যই, দু’চার পয়সার মত ছিল।
এখনকার জমানা ত ইউজ এন্ড থ্রো-এর। কে আর এইসব দোকানে আসবে! আমার জানতে ইচ্ছে হয় সেই সব দোকান কি আছে ? না থাকাটাই স্বাভাবিক! না থাকলে সেখানে কি হয় এখন, মানে কিসের দোকান এখন সেখানে ? আর সে ধরনের মানুষজনই বা কি করেন (এখন নিশ্চয়ই অন্য জীবিকাতেই আছেন, তাহলেও জানতে দারুন ইচ্ছে হয় কবে থেকে, কিভাবে, অন্য ক্ষেত্রে উত্তরন হয়েছে )!
আর এক ধরনের দোকান ছিল আগে। এখন শহরতলিতে দেখা গেলেও কলকাতা শহরের মধ্যে দেখা পাওয়া দুষ্কর। আস্তে আস্তে সেখানেও যে ডুমুরের ফুল হয়ে যাবে তা নিশ্চিতই বলা যায়।
আমার বহু পুরোন ঘড়ির ষ্টীলের রিষ্টব্যান্ড খারাপ হয়ে সেটা দীর্ঘদিন ব্যবহার করা যাচ্ছে না দেখে, সারাইয়ের দোকান খুঁজতে গিয়ে হয়রান হয়ে যখন আশা প্রায় ছেড়ে দিয়েছি, ভাবছি একে এবার ‘আলবিদা’ জানাতে হবে কিনা, তখন একদিন দেখি গড়িয়ার (পুরোদস্তুর শহর) ফুটপাথে চাদর বিছিয়ে একটি ছেলে নানাধরনের ঘড়ির পার্টস নিয়ে বসে আছে! সৌভাগ্যবশত কাজটা হল। গড়িয়া ছাড়িয়ে বারুইপুরের দিকে গেলে ঘড়ি সারাইয়ের দোকান এখনও মেলে এক আধটা। কিন্তু কতদিন মিলবে বলা শক্ত ! সেই ইউজ এন থ্রো ! ঘড়িও তেমনই হয়ে গেছে কিনা ! কিন্তু চল্লিশ বছরের পুরোন,বহু স্মৃতি জড়ানো ঘড়ি কি করে ‘থ্রো’ করা যায় তা ভেবে পাওয়া যায় না!
তেমনই রয়েছে জুতো সারাইয়ের দোকান, এদেরও শহুরে অঞ্চলে দেখা পাওয়া খুব মুশকিল। কারিগরেরা সব আসল শহর ছেড়ে শহরের সীমানার দিকে ছড়িয়ে পড়েছে। এমন দোকান একটা দেখতে পেয়েছিলাম পাটুলির এক গলিতে। অবশ্য জুতোও এখন “ইউজ এন থ্রো”! আগে হাওয়াই চপ্পলের ষ্ট্র্যাপ আলাদা কিনে লাগিয়ে নিয়ে আসা যেত এখন ব্যাপারটা বন্ধ হয়ে গেছে! খুঁজে পেতে পাওয়া যায় হয়ত কিন্তু নিজে লাগিয়ে নিতে হয়। না হলে পুরো সোলটাই “থ্রো”!
বাড়িতে তেমন চপ্পল থাকলে, আর শহরতলিতে যাবার থাকলে, সঙ্গে নিয়ে যাবেন। সেখানে পেয়ে যাবেন, সেখানে এখনও তেমন দোকান আছে।