আরজুকানের আয়না-২

সেই যে নরওয়ের আরজুকান শহরে শীতকালে চিরছায়াচ্ছন্ন অঞ্চলে সূর্যালোক উপস্থিত করতে আয়না লাগাবার কথা বলেছিলাম এর আগে, তা নিয়ে আবার বলছি।
সেপ্টেম্বর-২০১৩-এ সেই আয়না লেগে গেছে যথাস্থানে! ছবি দেখলাম কম্পিউটারে। পাশাপাশি তিনখানা আয়না, তিনখানা স্তম্ভের ওপর। স্তম্ভগুলো আবার একটা পাহাড়ের ওপর দাঁড় করানো। এদের উচ্চতা খুব একটা বেশী না হলেও, যেহেতু উঁচু পাহাড়ের ওপর রয়েছে তাই পাহাড় আর স্তম্ভ মিলিয়ে মাটি থেকে এদের উচ্চতা ৪৫০ মিটারের মতই ত’ হওয়ার কথা। উচ্চতার হিসেবটা তেমনই ত’ ছিল, নাকি!
এখন উত্তর গোলার্ধে শীতকাল আর দক্ষিন গোলার্ধে গ্রীষ্মকাল, তাই সূর্যের দক্ষিনায়ন চলছে অর্থাৎ দক্ষিনদিকে সে হেলে আছে। আমাদের এখানে যেমন দক্ষিনে হেলে থেকে পুবে উঠে পশ্চিমে অস্ত যায়, ওখানেও তাই-ই হয় বটে, তবে দক্ষিনে হেলাটা বড্ড বেশী! প্রায় দিগন্ত ঘেঁষে চলে যায়। মানে সূর্যের মাথার ওপর ওঠার উপায় একেবারেই নেই, চরাচর অন্ধকারে ডুবে যায়। গ্রীষ্মকালে, যখন সূর্য আমাদের এখানে মাথার ওপর ওঠে, তখন ওখানে ওপরে ওঠে সামান্যই, প্রায় পাহাড় ঘেঁষে চলে! এ সব দক্ষিন দিগন্তের ব্যাপার। তাহলে পাহাড়ের উত্তর দিকে, আড়ালে থাকা কোন কোন জায়গায় গ্রীষ্মে পেলেও সব জায়গাতে রোদ পাবে না, না গ্রীষ্মে, না শীতে। এটা সাধারন বুদ্ধিতেই বোঝা যায়।
আগেই বলেছি আরজুকান শহরটি দু’টি পাহাড়ের মধ্যবর্তী মালভুমি অঞ্চলে, তাই শহরটা চিরকাল না হলেও শীতকালে সূর্যালোক থেকে বঞ্চিত। উত্তরের পাহাড়ের মাথা বা গোড়ার কোন কোন জায়গায় গ্রীষ্মে রোদ পেলেও, শীতে কিন্তু সূর্যের আলো দক্ষিন দিগন্তের কাছ থেকে এসে মাটি থেকে ৪৫০ মিটার বা তার কিছু কম উচ্চতা দিয়ে বেরিয়ে যায়। তাই সেখানে আয়না রাখলে সূর্যালোক প্রতিফলিত হওয়ার সম্ভাবনা। সেই উদ্দেশ্যেই আয়নাগুলো রাখা হয়েছে।
আয়না আয়না করছি বলে মনে হচ্ছে যে হাতে ধরা আয়না বা আমাদের রোজ দেখতে পাওয়া ড্রেসিং টেবিলের বড় আয়নার মত যেমন হয়, তেমনি বুঝি ! তা কিন্তু মোটেই না। ছবি দেখলে বোঝা যাবে তা। আশেপাশে কর্মরত মানুষজন কেমন যেন পুতুল পুতুল মত। (এক এক খানা আয়নার সাইজ হল ৫৩৮ বর্গফুটের মত। মানে দৈর্ঘ্য-প্রস্থ মনে হয় ৩৩ ফুট x১৬.৫ ফুট এর মত (প্রায়)। এমন মাপের হলেই মানায়!)।
পাশাপাশি রাখা তিনখানা আয়না মিলে একখানা বিশাল আয়নার চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে পাহাড়ের মাথায়! ওপরের হিসেব মত তিনটে আয়না মিলে সাইজ হল প্রায় ৫০x৩৩ বর্গ ফুট । সেটাও দেখার মত।
আয়নাগুলোকে কিন্তু সব সময় সূর্যের অবস্থান অনুসারে নির্দিষ্ট দিকে মুখ করে থাকতে হবে যাতে সূর্য অবস্থান পাল্টালেও প্রতিফলিত আলো টাউনহল চত্বরে এক জায়গাতেই পড়ে, মানে আয়নারও অবস্থান পাল্টাতে হবে। সূর্য’ ত কোন সময় স্থির নয়, সদাই চলমান। তাই সে যখন ক্রমাগত পশ্চিম দিকে এগোয়, প্রতিফলিত আলোও টাউনহল চত্বরে এক জায়গায় স্থির থাকবে না। সেই কারনে আয়নাগুলো ‘সূর্যমুখী’। কিন্তু অতবড় আয়নাকে সরাবে কে!
কে আবার, বিদ্যুৎ-ই ত’ রয়েছে। ঐ আয়নার সাথেই রয়েছে বিশাল সোলার প্যানেল, যা তৈরী করবে সৌরবিদ্যুৎ। এই বিদ্যুৎ আয়নাগুলোকে প্রয়োজনমত ঘোরাবে ত’ বটেই, সেগুলোকে পরিষ্কারও করবে।
নেট ঘাঁটা ঘাঁটি করতে গিয়ে দেখছি এর আগেও তৈরী হয়েছে এমন আয়না,ইতালিতে ২০০৬-এ। প্রায় একই কেস আর কি। জায়গাটার নাম হল Viganella ( বাংলা উচ্চারন করতে পারছি না)। সেই থেকে এখনও সাপ্লাই করে যাচ্ছে সুর্যের আলো। এখানে আয়নার সংখ্যা হল ১৪ আর সে গুলো ষ্টীলের তৈরী! না, উল্টোপাল্টা বলিনি, ওগুলো সত্যিই ধাতব আয়না। কিন্তু ধাতুর আয়না ত আবার অন্য গল্প, পরে না হয় কোন সময় বলা যাবে।
কিন্তু এত কায়দা, এত খরচ করে আয়না তৈরী করা কেন তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে না ? একটা ত শীতকালে রোদ উপভোগের ব্যাপার রয়েছেই, এর সাথে রয়েছে অন্য একটা কারন, আর সেটাই আসল।
কয়েকমাস রোদ না পেলে ওখানকার মানুষজন SAD-Seasonal affective disorder নামের একটা বিটকেল অসুখে ভোগে। তাদের সুস্থ রাখার জন্য বিপুল খরচের এই সরকারি প্রচেষ্টা!
বুঝুন ব্যাপারটা!