আনসাং হিরো ?

শচিন তেন্ডুলকার অবসর নেবার পর, সম্মান জানাতে গোটা দেশ ত ঝাঁপালোই, সরকারও ‘ভারতরত্ন’, সাংসদপদ দিয়ে সে কাজের অংশিদার হলেন। কিচ্ছু বলার নেই। যোগ্য মানুষকে যোগ্য সম্মানই দেওয়া হয়েছে।
তবে এসব করার সময় অন্তত আরও একজন মানুষ অন্তত উল্লেখিত হতে পারতেন। তিনি নিঃসন্দেহে সুনীল গাভাসকার।
কিছু সময় বাদ দিলে গাভাসকার খেলেছেন খুব কঠিন সময়ে। অবশ্য, তখনকার দিনে সবাই-ই কঠিন অবস্থাতেই খেলতেন।
এখন ব্যাটসম্যানদের মাথা থেকে পা পর্যন্ত এমন পোষাক-আষাক পরানো হয়, দেখে মনে হয় যেন যুদ্ধ করতে পাঠানো হচ্ছে। পাছে তীব্রগতির বল খেলোয়াড়দের জখম করে ফেলে, তাই সর্ব অঙ্গ, মানে মাথা থেকে পা, বর্ম আঁটা! গাভাসকারের সময় এক অ্যাবডোমেন গার্ড ছাড়া আর কিছু থাকত বলে মনে হয় না। তবে পানামা টুপি কোন সময় খুলে ফেললে একটা আধা হেলমেটের (এখনকার মত পুরো নয়) মত কিছু নজরে পড়ত! ব্যস।
ক্লাইভ লয়েডের ওয়েষ্ট ইন্ডিজ দলে সে সময়ে খেলতেন জনাপাঁচেক পেসার, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে জনা চারেককে খেলাতেন তিনি, কোন স্পিনার নেবার দরকার বোধ করতেন না, প্রয়োজন হলে তিনি নিজে সামাল দিতেন। সমীহ আদায় করা নাম সে সব পেসারদের–ম্যালকম মার্শাল, অ্যান্ডি রবার্টস, জোয়েল গার্নার, মাইকেল হোল্ডিং, কার্টলি অ্যামোব্রোজ। আরও কেউ কেউ ছিলেন। সবার নাম মনে নেই। অষ্ট্রেলিয়া দলে সে সময় ছিলেন ডেনিস লিলি আর টমসনের মত বোলার। ইংল্যান্ড দলে সে সময় কারা খেলতেন সেটা মনে করতে পারছি না, ক্রিস ওল্ড বা বব উইলিস হলেও হতে পারেন। পাকিস্তানের ছিলেন ইমরান, ইউনুস, আক্রামেরা। মানে, বিশ্বের সর্বকালের সেরা পেস বোলার সব! আধুনিক খেলোয়াড়দের নাম মনে রেখেও বলা যায়, এমন খেলোয়াড় আজকাল প্রায় অপ্রতুল! শচিন পাকিস্তানি খেলোয়াড়, শেষ দিকে গ্লেন ম্যাকগ্রা, ব্রেট লি, আর ওয়েষ্ট ইন্ডিজের ওয়ালশ ছাড়া আর বিশেষ শক্ত বোলারের মোকাবিলা করেন নি বলেই মনে হয়। আর বিশেষ কারও কথা মনে পড়ছে না। থাকলে পাঠক মনে করালে উপকৃত হব।
মার্শাল স্বাভাবিক চেহারার হলেও ওঁর দৌড় ছিল দেখার মত, আমার ত মনে হয় অলিম্পিকে ১০০ মিটার স্প্রিন্টে অংশ নিলে অনেকেরই শংকার কারন হতে পারতেন, তার ওপর ছিল ভয়ংকর পেস বোলিং। ভয়ংকর চেহারা ছিল গার্নার আর অ্যামব্রোজের, সাত ফুটের কাছাকাছি উচ্চতার খেলোয়াড়রা দৌড়ে এসে যখন বল করতেন তখন দু’তিন গজের সুবিধা পেয়েই যেতেন, যেটা অন্য বোলারেরা পেতেন না।
কোন গার্ড না নিয়ে এঁদের সামনা সামনি হতে বুকের পাটার প্রয়োজন হয়, যেটা গাভাসকারের অবশ্যই ছিল, তেন্ডুলকারের ক্ষেত্রে সেটা প্রমানিত হয়েছে বলে মনে হয় না। হলেও গাভাসকারের মত করে হয় নি।
তবে গাভাসকারের সময় একটা ঘটনা ঘটেছিল। সেটা ছিল কেরি প্যাকারের ‘সার্কাস’! সেই সময় ভারত ছাড়া বিশ্বের অন্য ক্রিকেট খেলুড়ে দেশের সব শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়দের প্যাকার সাহেব যাকে বলে কিনে নেওয়া, প্রায় তাই-ই নিয়ে ছিলেন! ফলে ভাল ভাল বোলাররা টাকার পাহাড়ে চেপে টেষ্ট খেলা ছেড়ে দেন কয়েক বছরের জন্য। সেই সময় গাভাসকার বেশ কয়েকটা শতরান করে ফেলেন।
সম্ভবত, ১৯৯৬ এর বিশ্বকাপের সময় থেকেই একটা ধারনা চালু হয়েছিল যে “স্লগ ওভার” হল শুরুর প্রথম ১৫ ওভার আর শেষের ১০ ওভার। এর আগে কেবলমাত্র শেষেরটার কথাই ভাবা হত। আর যেহেতু গাভাসকার ওপেনিং ব্যাটসম্যান ছিলেন তাই তিনি টেষ্টের মত ধরে খেলতেন, কখনও পিটিয়ে খেলেননি। শুনতে অবাক লাগবে একথা ভেবে যে, মোট ১০৮টি খেলে তিনি মাত্র ১টি শতরান করেন, তাও দলের প্রয়োজনে অধিনায়ক কপিল দেবের আগ্রহাতিশয্যে! কপিল বাধ্য না করলে সেটাও হত কিনা সন্দেহ!
এছাড়াও আর একটা অবাক করা ব্যাপার আছে। আগে প্রতি দল ৬০ওভার করে খেলত, এখনকার মত ৫০ নয়। গাভাসকার একটা খেলায় পুরো ষাট ওভার খেলে নট আউট থেকে যান, রান করেন মাত্র ৩৬ । যা একদমই হাস্যকর। এখনকার আবহে এই সময়ে হয়ত হয়ে যেতে পারত ব্যক্তিগত ২৫০ রান ! হয়ত বা তারও বেশী।
ওপরের বিষয়টা বাদ দিলে বাকি সব বিষয়ে কিন্তু গাভাসকার, শচিনের থেকে বিশেষ পেছনে থাকবেন না! পরিসংখ্যান দেখলে বোঝা যাবে একথা।
একটু তুলনা করি। শচিন খেলেছেন ২০০ টেষ্ট আর শতরান করেছেন ৫১ টি। সাফল্যের হার শতকরা ২৫.৫ এর মত। আর একদিনের খেলায় তিনি ৪৬৩ খেলায় ৪৯টি শতরান করেন, সাফল্যের হার শতকরা ১০.৫ ।
এবার গাভাসকারেরটা দেখা যাক। তিনি ১২৫ ম্যাচে ৩৪ টি শতরান করেন যাতে সাফল্য শতকরা ২৭ এর সামান্য বেশী। ২০০ ম্যাচ খেললে শচিনকে ধরে ফেলা একেবারে অসম্ভব ছিল না। একদিনের খেলায় অবশ্য এ তুলনা আসেই না। ১০৮ ম্যাচে মাত্র একটা শতরান। এতে শতকরা হার একেরও কম। তবে এ সময়ের খেলোয়াড় হলে তাঁর এই হার নিশ্চয়ই থাকত না, অন্যদের মত তাঁরও হার বেড়ে যেত নিশ্চয়ই। এমন খেলোয়াড়ের ক্ষেত্রে একথা বলা যেতেই পারে। তবে কি হলে কি হত সেটা কোন কাজের কথা নয়। যা হয়েছে তা-ই মনে রেখে তাঁর কৃতিত্বের স্বীকৃতি অবশ্যই প্রাপ্য ছিল।
তবে শচিনের আন্তর্জাতিক আঙ্গিনায় ১০০ টি শতরান অবশ্যই অতুলনীয়। আর কেউ আদৌ পারবেন কিনা এখনই বলা যাচ্ছে না।
শচিন বন্দনায় গাভাসকারকে একেবারে ভুলে গেলে একটা অবিচার হয়ে যেতে পারে!