সত্যান্বেষী- বিলেটেড রিভিউ

কিছুদিন আগে এক বন্ধু জিজ্ঞেস করেছিল এই ছবিটা নিয়ে রিভিউ বেরিয়েছে কিনা। আমাদের কফিহাউজে বোধ হয় ছোট করে একটা লেখা বেরিয়েছিল, তা ভাবলাম আরেকটি বিশদে লিখি। খুব শিগগির টিভিতে আবার দেখাবে কোন একটা চ্যানেলে, তারপরে এদিকে আবার আমাদের চা-পাতা বলছে ফ্লিপকার্টে গিয়ে কিনবে – খবর্দার কিনিস না মা! কেন, সেটা ওই যেদিন টিভিতে দেবে, দেখেই বুঝবি!!

যাকগে, কাজের কথায় আসি। প্রথমেই বলি, ঋতুপর্ণ ঘোষ বড়ই অকালে প্রয়াত হওয়াতে আমি আন্তরিক ভাবে দুঃখিত। নানা কারণে ওনার গত কয়েক বছরে তৈরি বেশিরভাগ ছবিই আমার দেখা হয়নি। সত্যান্বেষীও টিভিতেই দেখেছি। কিন্তু আমি ওনার লেখার খুব ভক্ত। ঋতুপর্ণের বাংলা লেখা এতই সুন্দর, পড়লেও মন ভাল হয়ে যেত। ওনার ভাবনা চিন্তার প্রসার আমাকে বারে বারে মুগ্ধ করেছে। ওনার প্রথম দিকের বেশ কয়েকটি ছবি আমাকে অন্য রকম ভাবে ভাবতে শিখিয়েছে। আর সেই সব কারণেই আমি এই ছবিটি দেখে হতাশ।

ছবির শুরুতে দেখা যায় এক বয়স্ক পুরুষের সাথে দুটি যুবতী , নানা জিনিষ নিয়ে, সম্ভবত নদীর পাড় দিয়ে হেঁটে চলেছে। তারা একটু বিশ্রাম নিতে থামে, ছোট মেয়েটি প্রাকৃতিক কাজের উদ্দেশ্যে একটু আড়ালে যায়, তার পরে কি যেন একটা ঘটে- তার শুধু আর্ত চিৎকার শোনা যায়।যেদিন ছবিটি দেখেছিলাম, সেদিন সেই বিপদের উৎস সম্পর্কে সমপূর্ণ অন্য ধারণা জন্মেছিল, আজকে আবার লেখার কথা ভাবতে ভাবে অন্য ধারনা জন্মাল।

যাইহোক, তারপরেই বোধ হয় ফ্ল্যাশ ফরওয়ার্ড করে ব্যোমকেশ এবং অজিতের রাজবাড়ি, নাকি জমিদারবাড়িতে আবির্ভাব। এইখানে একটা কথা বলে রাখি, রজিত কাপুর আর কে কে রায়নার পরে, আমার আর কোন ব্যোমকেশ বা কোন অজিতকেই পোষায়নি। এরপরে পুরোটাই গোলমাল। এক অকারণ নারী চরিত্র, যাকে বিনাকারণে প্রচুর স্ক্রিন স্পেস দেওয়া হয়েছে। বরং অন্য নারী চরিত্র, যেটি আদতে গুরুত্বপূর্ণ, তাকে প্রায় দেখাই যায়না। প্রথম চরিত্রাভিনেত্রী হলে অর্পিতা চ্যাটার্জি। এই অবধি লিখেই মনে সন্দ জাগছে- উনিও কি নিজের কত্তার মত পরিচালকের সাথে জোর জবরদস্তি করে এই চরিত্র তৈরি করিয়েছিলেন? সারা ফিল্ম জুড়ে এঁর কাজ কি? – একটা সদ্য রিলিজ হওয়া হিন্দি ছবির গান গুনগুন করা, এক লাইব্রেরিয়ান এর সামনে মুগ্ধ হয়ে দামি শাড়ি গয়না পড়ে বসে কালিদাসের মেঘদূত শোনা, আর শেষ অবধি জানতে পারা যায় তিনি নাকি বিছানায় শীতল , তাই বরের সাথে মনোমালিন্য !! বোঝ কান্ড। ও, আরো একটা কাজ করেন- মাঝে মাঝে অজিতের সাথে বসে গল্প করেন, তাই নিয়ে আবার ব্যোমকেশ টিপ্পনী দেন। সেই জমিদারির নাম “বলবন্তপুর”- কেন, তাই নিয়ে ব্যোমকেশ আর অজিত গভীর আলোচনা করেন। শেষের দিকে বোঝা যায়, সেই যে বৃদ্ধের কথা প্রথমে বলা হয়েছিল, তার মেয়ে যে কিনা সেক্সুয়ালি ফ্রিজিড জমিদার গিন্নীর ঝি, সে জমিদারের সন্তানকে গর্ভে ধারণ করছে, তাই তার বাবা তার প্রেমিককে , যে কিনা সেই মেঘদূত পাঠ করা লাইব্রেরিয়ান, তাকে,বাঘের ডাক ডেকে চোরাবালিতে ডুবিয়ে মারলেন। বেশ , তা ভাল! কিন্তু তার জন্য সেই বাবার সিন্দুকে বিরাট বড় বাঘের পায়ের মাপের কাঠের থাবা, আর বাঘের মুখোশ থাকার কি দরকার তা বুঝলাম না। থাবাটা তাও বুঝলাম, মুখোশের প্রয়োজনীয়তা একেবারেই বুঝলাম না। সেই বিধবা মেয়ে আবার বনের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়া প্রেমিককে ময়ূরের পালক দিয়ে আদর করে। সেটা সে হঠাত কোথায় পেল, সে নিয়ে আমার মনে প্রশ্ন আছে। ছবির শেষে সেই ময়ূরের পালক বালির চরে পড়ে থাকে। পরিচালক তাঁর শেষের দিকের অভিনীত এবং নির্দেশিত কিছু ছবির মত, এখানেও রাধা-কৃষ্ণ-প্রণয়লীলা-দেহতত্ব-ইত্যাদি-প্রভৃতি-আরো গভীর অনেক কিছু বোঝাতে চেয়েছিলেন কিনা , বা আনার ইচ্ছা ছিল কিনা আমার জানা নাই। উৎসাহী কমেন্টদাতা কেউ আলোকপাত করলে খুশি হব।
আরেকটা কথা- চোরাবালিতে মানুষ ডুবে যাচ্ছে, এই দেখাতে যে কম্পিউটার গ্রাফিক্স ব্যবহার করা হয়েছে, তা একেবারেই যা তা।
মোদ্দা কথা, পুরো ছবিটা জুড়ে অযত্নের ছাপ। হয়ত পরিচালক সেই সময়ে সত্যিই অসুস্থ ছিলেন। ঠিক ঠাক মন দিতে পারেন নি। কারণ আরো অনেক ছোট খাট বিষয়ে প্রশ্ন জেগেছিল দেখার সময়ে, সেগুলির সব কথা আলাদা করে আর বললাম না। সুজয় ঘোষ চেহারায় হয়ত তাও মানিয়ে গেছেন, কিন্তু গলার আওয়াজটা মোটেও যুতের নয়। অনিন্দ্যকে যে লুক দেওয়া হয়েছিল, তাতে তিনি অজিত কম, বরং রবিঠাকুরের গল্পের ব্রাক্ষ যুবক রূপে বেশি মানাবেন। যেটা সবথেকে চোখে লাগে, সেটা হচ্ছে ২২-২৩ এর তরুনীর ভূমিকায় অর্পিতাকে দেখে! ঋতুপর্ণ ঘোষের ছবি বলেই তখন মনে হয়েছিল, উনি কোন বেয়াক্কেলে আবদারে সাড়া দিতে বাধ্য হয়েছিলেন কি? যেমন হয়েছিলেন ‘নৌকাডুবি’ বানানোর সময়ে ?
ছবিটা দেখার পরে মূল গল্পটা নতুন করে আবার পড়েছিলাম। সেখানে অবশ্যই নারী চরিত্র দুটি, এবং নাম-কে-ওয়াস্তে। তা তাতে ক্ষতি কি ছিল? ওই গল্পটা নিয়ে কাজ করলেই হত। আধুনিক ভাল গল্প বা ভাল ছবি মানেই কি তাতে চাট্টি শারিরীক চাহিদা এবং তার থেকে উঠে আসা জটিলতা বা হতাশা দেখাতে হবে? শরদিন্দু তো সেই কোন যুগেই সেইসব ছাড়াই প্রচুর ভাল গল্প লিখে গেছেন- শুধু ব্যোমকেশ নয়, আরো অনেক গল্প, এমন কি সিনেমার চিত্রনাট্যও। এখনো এদিক-সেদিক খুঁজলে সেই ধাঁচের অনেক ভাল ছবি দেখা যাবে। কিন্তু সে কথা থাক, সে আরেকদিন আলোচনা হবে।