অবাক বন্ধুত্ব !

আজ (৬/১১/১৩) সকালে দশটা নাগাদ টিভি-তে চ্যানেল সার্ফিং করছিলাম, সময় কাটাবার জন্য। হঠাৎ Nat Geo Wild-এ এসে থমকে দাঁড়াতে হল! দেখি, একজন মানুষ একটি ভয়ানক দর্শন কুমিরের সাথে নিশ্চিন্তে সাঁতার কাটছে। আবার গায়ে গলায় হাত বুলিয়ে আদরও করছে! চমকে, থমকে গেলাম। ক্রমশঃ দেখতে দেখতে আগ্রহ জন্মে গেল বিষয়ে।
আশ্চর্য গল্প প্রকাশ পেল। ঘটনাস্থল আফ্রিকা মহাদেশ। কুমিরটি যখন বেশ ছোট ছিল, তখন “চিটো”র (মানুষটির নাম, নামটি জিটোও হতে পারে, ঠিক বোঝা যাচ্ছিল না) নজরে পড়ে গুরুতর আহত কুমিরটিকে। তিনি দয়া পরবশ হয়ে বাড়ি নিয়ে এসে গৃহসংলগ্ন জলাশয়ে রাখেন, এবং অতি যত্নে তার শুশ্রষায় লেগে পড়েন। ক্রমে কুমিরটি ( নাম “পোচো” বা “কোচো”, এটাও ভাল করে বুঝতে পারিনি) নিয়মিত খাওয়া-দাওয়া,ওষুধ-পত্র ও আদর যত্নে সেরে ওঠে। কালক্রমে সে বিশাল আকার প্রাপ্ত হয়, এবং ক্রমশঃ উভয়ের মধ্যে প্রগাঢ় বন্ধুত্ব হয়ে যায়। এর পর পোচো, চিটোর নির্দেশ/ইশারা শিখে ফেলে, একে অপরের বন্ধুর মত থাকতে শুরু করে।
চিটোর ইতিমধ্যে নেশার মত হয়ে গেছে বন্য প্রানীদের শুশ্রষা করা (এই জায়গাটা অন্যমনষ্ক হয়ে পড়েছিলাম বা সব কথা বুঝিনি)। বনে-জঙ্গলে রাতবিরেতে ঘুরে ঘুরে জীবজন্তু খুঁজে বেড়ানো, জঙ্গলে রাত কাটানো (মশা, পোকামাকড় অন্য বিপদ উপেক্ষা করে)– এসব দেখে দেশের শান্তিরক্ষকেরা অনেক চেষ্টা করেও ভদ্রলোককে বাড়িতে বাঁধতে পারল না, পাগল ভেবে তারা হাল ছেড়ে দিল। পাগলের উদ্ভট কান্ডকারখানা দেখে স্ত্রী-ও তাঁকে পরিত্যাগ করে চলে গেলেন। কিন্তু মানুষটির নেশা কাটল না। কুমিরে মজে রইলেন! তবে, বাড়িতে মহিলা না থাকলে চলে! তিনি আবার বিয়ে করলেন, সংসারী হলেন, তাঁর একটি কন্যাসন্তান জন্মাল। স্ত্রী প্রথমে না জানলেও একদিন রাতে জলাশয়ে স্বামীকে কুমিরের সাথে দেখে হতভম্ব হয়ে পড়েন!
যিনি এপিসোডটি বর্ণনা করছেন (এঁকে আমরা ‘কথক’ বলব এখন থেকে) তিনি একদিন দেখলেন চিটোর বাড়ির সামনে বেশ ভিড় এবং মানুষজন টিকিটের মত কিছু কিনছে! আরও খোঁজ নিয়ে জানলেন যে চিটোর সাথে কুমিরের বন্ধুত্ব দেখতেই আসছেন টিকিট কেটে!
এটা কথক ভদ্রলোক ভালভাবে নিতে পারলেন না, টাকা উপায়ের একটা ফিকির ভেবে তিনি চিটোর ক্রিয়া কলাপ সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করলেন। তিনি ভাবলেন যে কুমিরের স্বভাবটা নিশ্চয়ই শান্ত, এবং চিটো-পোচোর বন্ধুত্ব কোন বিশেষ ঘটনা নয়, এবং চিটো সেই সুযোগে কিছু উপার্জন করে নিচ্ছে! আর পোচো শান্ত স্বভাবের হওয়ায় তিনিও পোচোর সাথে বন্ধুত্ব করে নিতে পারবেন! এতে চিটোর বাহাদুরি করা বন্ধ হবে!
কথক চিটোকে জানালেন যে তিনি কুমিরের কাছে যেতে চান, এবং তাকে আদর করতে চান! চিটো অবাক হলেও রাজী হলেন।
প্রথম এক-আধ বার কিছু না বললেও, কথক ভদ্রলোক কুমিরের খুব কাছাকাছি হতেই সে এমন অস্থির আর ভয়ংকর হয়ে উঠল যে তিনি ভয়ে তাড়াতাড়ি জল ছাড়লেন। এবং বিশ্বাস করলেন যে চিটোর বন্ধুত্ব কোন ভাঁওতাবাজি নয়!
তবে তাঁর একটা চিন্তা হল যে কুমিরের যা বয়স তাতে সে শ’খানেক বছর হেসেখেলে বেঁচে থাকবে, অথচ চিটো ত অতদিন বাঁচবেন না! তখন পোচোর দেখভাল কে করবে ? একথা শুনবার পর অনেক ভেবে চিটো সাব্যস্ত করলেন যে মেয়েকে সেই দায়িত্ব দেবেন! সেই অনুসারে কিশোরী শাকিরা (মেয়ে)-কে তিনি চিটোর ভাষা শেখাতে লাগলেন।
কিন্তু–
কিন্তু কিছুদিন পর কথক একদিন এক দুঃসংবাদ পেলেন। কোন কারণে কুমিরটির (পোচো) মৃত্যু হয়েছে।
সিমলিপালের ‘খৈরী’-কাহিনি বা ‘বর্ন ফ্রি’র সিংহি-কাহিনি শোনা ছিল। আগে না জানলেও এখন পোচো-কাহিনি শুনে অবাক হলাম! প্রায় ওদের সমগোত্রীয় কাহিনি আর কি!