হেমন্তে নয়; শরতে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়

রাত পেরোনো ব্যালে ট্রুপে জুড়ে ছিলো কিছু টুপটাপ অন্ধকার। নৈঃশব্দে ঠাসা গ্রামোফোনের রেকর্ডগুলো জানিয়ে গেছে- যে লোকটা বহু কিছু ধরে রাখার মধ্যে ছিলেন না কোনোদিন, তিনি মৃত্যুর আগেরক্ষণ পর্যন্ত ছাড়তে পারেননি একটি জিনিশ। তা হলো স্টেট এক্সপ্রেস ফাইভ ফিফটি ফাইভ। তিনি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। ‘ছোট নীড়’ থেকে যাত্রা শুরু করে যিনি ‘রানার’ হয়ে চলে গেলেন ১৯৮৯-এর ২৬ সেপ্টেম্বর। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাঁর এই বাল্যবন্ধু হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে একটা বই-ই লিখে ফেলেছিলেন ‘হেমন্তর কী মন্তর’। প্রবীণ বয়েসেও কবি ঠাওরে উঠতে পারেননি, বন্ধুটির জাদুটা ঠিক কোথায়; গলায়, চেহারায়, মনে না হৃদয়ে?

হেমন্ত আজকে যতোটা মাহেন্দ্রক্ষণের তখন ততোটা ছিলেন না। কাগজে বেশ সমালোচনা ছাপা হতো তাঁর নামে। তিনি ঠাঁয় বসে থেকে সেগুলো শুনতেন। শঙ্করলার ভট্টাচার্য একবার বেশ ক্ষেপে গিয়েই জিজ্ঞেস করলেন- কিছু বলছেন না কেনো? কি সব লিখে বেড়াচ্ছে লোকজন! হেমন্ত স্বভাবসুলভ হাসি হেসে লেখক বিমল মিত্রের একটা পরামর্শের উল্লেখ করেছিলেন। বললেন- “কাগজে নিন্দেমন্দ গাইছে শুনে বিমলবাবু বললেন, ‘আনন্দ করুন! আনন্দ করুন! সমালোচনা, নিন্দেটিন্দে হচ্ছে, মানে আপনার নাম হচ্ছে। নাম-যশের ওর চেয়ে ভালো দাড়িপাল্লা হয় না’।”

আধুনিক বাঙলা গানের আকাশে হেমন্ত যতোটা শুকতারা, রবীন্দ্রসঙ্গীতের আকাশে ততোটা নন- অন্তত আমার তা-ই ধারণা। কলেজে পড়ার সময় মনে হতো, ভদ্রলোক ইঞ্জিনিয়ারিঙ আর গীতবিতানের পার্থক্য বোঝেন না। এরপর শ্রোতা হিশেবে রবীন্দ্রসঙ্গীতেও তাঁকে পাশ মার্ক দিয়েছি। ’৮৭ কী ’৮৮ সালে ক্যাসেটের শারদ সম্ভারের উদ্বোধন আয়োজন করেছিলো ‘সাউন্ড উইং সংস্থা’ দক্ষিণ কোলকাতার পল ম্যানসনে। একেবারে শেষে ওরা বাজালো ‘সত্তর দশকের হেমন্ত’ নামের ক্যাসেট থেকে ‘কৃষ্ণকলি’ গানটা। ‘কৃষ্ণকলি’র এহেন স্বপ্নিল রেন্ডারিং তখনও শোনেননি বাঙলা গানের শ্রোতারা। সকলে মন্ত্রমুগ্ধ হলেও চোখে জল নিয়ে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন- ‘এটা সুচিত্রা মিত্রের প্রিয় গান। তাই গাই না, এখন। এটা ওর মতো করে কেউ গাইতে পারে না। ওঁর গান ওঁরই থাক। তোমরা আমার ক্যাসেটটা শুনো’। হেমন্তই বুঝেছিলেন ‘কৃষ্ণকলি’ সুচিত্রা মিত্রের মতো করে কেউ গাইতে পারেন না, কোনোদিন পারবেনও না।

কিছুদিন আগে জগন্নাথ বসুর ‘পরচর্চা’ পড়ছিলাম। সেখানেই পড়েছিলাম; জগন্নাথ বসু ছাত্রাবস্থায় স্কটিশ চার্চ কলেজের সোশ্যালে সভাপতি হবার আবেদন নিয়ে ঋত্বিক ঘটকের কাছে গিয়েছিলেন। ঋত্বিক জিগ্যেস করলেন- কে গাইবে গান? উত্তর- হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। ওঁকে কতো দিবি? টাকার অঙ্কটা শুনে ঋত্বিকের শিশুসুলভ প্রশ্ন- তা, আমায় দশটা টাকা দিবি তো?

অঙ্ক না মেলাতে পারলে ইঞ্জিনিয়ারিঙ হয় না। দশ টাকার অঙ্কও তো অঙ্কই। হোক না তা ঋত্ত্বিক ঘটকের। হেমন্তের মতো শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেও নিজেকে তৈরি করতে হয়। সময় লাগে। তৈরি হতে হতে ছাব্বিশ তারিখটা পেরিয়ে যায়। সাতাশ তারিখ এসে পড়ে।

হেমন্ত তো তারিখের চৌকাঠে বন্দী নন। তাঁকে বৃথাই তারিখ মেনে শ্রদ্ধা জানাতে চাইলে, অঙ্কটা আর মিলবে না কোনোদিন।