প্রীতিলতা- হৃদয়ে ছড়ানো রোদ্দুর আমার

প্রীতিলতা

তোমাকে জেনেছিলাম বেথোফেনের আশ্চর্য ফিফথ সিম্ফোনিতে; জেনেছিলাম, যখন শাপগ্রস্ত আমাদের মৃত্যু শহরের শরীরকে পরিত্যাগ করে বিপ্লব তার নিজ পায়ে হেঁটে চলে গেছে অন্যত্র। তোমার মহিমান্বিত আঙুলের ছাপ নাকি এখনও বড্ডো বেশি সজীব হয়ে আছে ‘ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাই’ বইয়ের পাতায় পাতায়, যা আত্মস্থ করবার পর তুমি বিপ্লবী কল্পনা দত্তকে লিখেছিলে- ‘কোনো কোনো সময় আমরা স্বপ্ন দেখতাম বড়ো বিজ্ঞানী হবো। সেই সময় ঝাঁসীর রানী আমাদের চেতনাকে উদ্দীপ্ত করে। নিজেদেরকে আমরা অকুতোভয় বিপ্লবী হিশেবে দেখা শুরু করলাম’।

প্রীতিলতা। তোমার বুকের গভীরের কোথায় লুকিয়ে রেখেছিলে এক টুকরো নিটোল না-ছোঁয়া বিপ্লবের বহ্নিশিখাকে, যার পরতে পরতে লুকিয়ে ছিলো প্রাণিত হবার মূলমন্ত্র। পূর্ণেন্দু দস্তিদার দেয়া বইগুলোও কী রেখে দিয়েছিলে সেখানে, যেখানে বাতিঘরের উষ্ণতায় ধরা পড়ে তোমার প্রাণেশ্বরী মহা-সকাল। নির্মম রেড অর্ডিন্যান্সের কিনারা ঘেঁষে তুমি কেমন চলে গিয়েছিলে ‘ক্ষুদিরাম’, ‘বাঘা যতীন’, ‘কানাইলাল’, ‘দেশের কথা ও সরকারী রাউলাট কমিশন’- এর কার্নিশে; সত্যিই, তুমি বিজ্ঞানী নও, অমর হবার জন্যই জন্মেছিলে।

ডা. খাস্তগীর উচ্চ ইংরেজি বালিকা বিদ্যালয়ের সূর্যমুখী মেয়েটি নিজেই কেমন সূর্য হয়ে উঠলো, আলোর তরল জলে স্নান সেরে এসে হাত ধরলো লীলা নাগের- ‘দীপালী সংঘ’ তখন ফোরগ্রাউন্ড, ব্যাকগ্রাউন্ডে আশ্চর্য দ্বীপান্বিতা স্বাধীনতা।

তুমি গ্রহণ করবার পর থেকে পটাশিয়াম সায়ানাইডে আর বিষ নেই; শুনেছি সেদিন থেকে তার আনবিক সঙকেতের আকাশে নাকি চাঁদ উঠে- লাল চাঁদ; প্রতুলের ছোকরা চাঁদ, জোয়ান চাঁদের সাথে সে হাত ধরাধরি করে হাঁটে বিপন্নতার পথে- গন্তব্য তার মুক্তি, বিপ্লবের পূর্বাশা। তুমি তোমার শেষ চিঠিটি লিখেছিলে তোমার মায়ের কাছে, তাঁকে বলেছিলে- মাগো, অমন করে কেঁদো না! আমি যে সত্যের জন্য, স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিতে এসেছি, তুমি কি তাতে আনন্দ পাও না? কী করবো মা? দেশ যে পরাধীন! দেশবাসী বিদেশির অত্যাচারে জর্জরিত! দেশমাতৃকা যে শৃঙ্খলভাবে অবনতা, লাঞ্ছিতা, অবমানিতা! তুমি কি সবই নীরবে সহ্য করবে মা? একটি সন্তানকেও কি তুমি মুক্তির জন্য উৎসর্গ করতে পারবে না? তুমি কি কেবলই কাঁদবে?

ইয়ঙ-এর মাদার কমপ্লেক্সের বাইরে এসেই বলছি- মায়েরা সন্তানদের মুক্তির জন্য উৎসর্গ করতে জানেন, সত্যিই তাঁরা কাঁদেন না; কেবল আমরা, সন্তানেরাই নিজেদের দায়িত্ব ভুলে যাই। আমরা সন্তানেরাই প্রীতিলতা হতে পারি না।