এমন-ই ত’ হওয়ার ছিল।

(লেখাটা বড় হয়ে গেছে, কিন্তু উপায় নেই, ছোট ছোট করে বার দু’এক দেওয়া যেত হয়ত, তাতে করে রসভঙ্গ হওয়ার সম্ভাবনাও থাকত। তাই মডারেটারের কাছে আবেদন যে, এই বার অন্ততঃ কাটাকুটি করবেন না।)
আবার যন্ত্রগনক, মানে কম্প্যুটার, আমাকে টেনে বসালো কি-প্যাডের সামনে! বছর দু’এক আগে একবার ফ্যান্টাসি বা উদ্ভট উদ্ভট কথা লিখিয়েছিল আমাকে দিয়ে (কফি হাউসে নয়, অন্যত্র) ! তবে এবার কিন্তু একেবারে সত্য ঘটনা! তাই আজগুবি ভেবে পাতা উল্টে গেলে একদম চলবে না!
উত্তর ইউরোপের নরওয়ে দেশের কোন এক শহরের বয়স ১০০ বছর হলেও, এযাবৎ নাকি সূর্যের আলোর দেখা পায়নি, না গ্রীষ্মে, না শীতে! এবার এই প্রথম বার দেখা পাবে এই শীতে! কি, ভারি আশ্চর্য লাগছে ? না ? বলব ব্যাপারটা, তবে তার আগে আমাদের বাসস্থান ধরিত্রীদেবীর কিছু কিছু আজব কাজকর্মের কথা বলতে হবে। না হলে সবটা পরিষ্কার হবে না।
ভুগোলের পাঠে সাহায্য করে যে গ্লোব, তা দেখেছেন ত ? বইয়ের দোকানে গেলেই দেখতে পাবেন। ভাল করে দেখলে বুঝবেন কেমন একদিকে হেলে দাঁড়িয়ে আছে। এর অর্থ উত্তর মেরু আর দক্ষিণ মেরু সংযোগকারি কাল্পনিক রেখা যার নাম “অক্ষ”, সে হেলে আছে একদিকে ! কখনও কোন গ্লোব ঠিক সোজা উল্লম্ব (vertical) অবস্থায় দেখেছেন ? না, দেখেননি! কারণটা কি বলুন’ত ? খুব সোজা। আমাদের পৃথিবীও একদিকে হেলে (Axial Tilt) দাঁড়িয়ে একমনে ঘুরে চলেছে, সেই আদ্দিকাল থেকে, মানে যেদিন তার জন্ম হয়েছিল, সেদিন থেকে! গ্লোবটা ত তার কপি(Copy) কিনা, উল্লম্ব হবে কি করে !
এখানে দু’টো কথা বলার রয়েছে। প্রথম হল, একদিকে হেলে থাকা। আর তা’ কত ডিগ্রি হেলানো? না,উল্লম্ব রেখার সাথে ২৩.৫ ডিগ্রি কোণে। আর দ্বিতীয় হল, ঐ যে একমনে ঘোরার কথা বললাম, সেই ঘোরাটা। সেটা হল দু’রকমের। একটা হল নিজের অক্ষের চারিদিকে ২৪ ঘন্টায় একবার করে। পৃথিবীর পরিধি ২৫০০০ মাইল বা ৪০০০০ হাজার কিমি-এর ওপর! তাহলে ঘন্টায় হাজারখানেকের বেশী মাইল বা ষোলশ’ কি মি বা সেকেন্ডে ৪৫ মিটার-এরও বেশী বেগে ঘুরছি আমরা সবাই! একটা ঘুরন্ত লাট্টুর ওপর পিঁপড়ে থাকলে তার যা অবস্থা হয় আমাদেরও সেই একই অবস্থা! আবার,ঐ ঘুরতে ঘুরতেই সূর্যের চারিদিকে নিজের কক্ষপথেও ছুটছি প্রবল বেগে, প্রায় সেকেন্ডে ৩০ কি মি!
এমন উল্টোপাল্টা বেগে চললে আমাদের অবস্থা কাহিল হওয়ার কথা, কিন্তু আমরা বুঝতেই পারি না! ভারি আশ্চর্য! বরং আরও আশ্চর্য আশ্চর্য কিছু ঘটনা ঘটায় এই ঘূর্ণন। কি তা বলতে পারেন ?
এই মুহূর্তে মনে পড়ছে একটাই, যার প্রভাবেও আরও অনেক কিছু ঘটে। তা হল ঋতুপরিবর্তন! সূর্যের সাপেক্ষে পৃথিবীর চার বিশেষ অবস্থানের কারণে আমরা চার ঋতু পাই সমস্ত পৃথিবি জুড়ে। অন্য পারিপার্শ্বিক কারণে আমরা আরও দুটো বাড়িয়ে নিয়েছি। অর্থাৎ সবাই গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীত আর বসন্ত পেলেও আমরা বর্ষা আর শীতের মাঝে শরৎ আর হেমন্ত বাগিয়ে নিয়েছি।
ঋতু পরিবর্তন না থাকলে রোদ, বৃষ্টি, শীত-গ্রীষ্ম, আবহাওয়ার পরিবর্তন, চাষ-বাস আরও কত কি হত না! সর্বোপরি প্রাণের সৃষ্টিই ত’ হত না!
কে পৃথিবীকে এমন হেলে থাকতে বাধ্য করল, কেন করল, তার কোন উত্তর নেই। কেউ বলেন ঈশ্বর, ত’ কেউ বলবেন প্রকৃতিদেবী! যিনিই করে থাকুন, তিনি না থাকলে আর পৃথিবীকে না হেলালে আমরাই ত হতাম না! কি অদ্ভুত আর আশ্চর্যজনক কথা! ভাবলে অবাক লাগে না ? তবে তিনি যা করেছেন, জেনেই করুন বা না জেনেই করুন, সেটা যে প্রানীজগতের উপকারার্থে হয়েছে, সে কথা নিশ্চয়ই বলতে হবে না!
বিজ্ঞানীরা অনেক ভেবে চিন্তে বার করেছেন যে কোটী, কোটী বছর আগে যখন পৃথিবী সৃষ্টি হচ্ছিল তখন সময়টা ছিল ভারি অশান্ত। বিশাল, বিশাল আকারের প্রস্তরখন্ড এদিক ওদিক ছুটে বেড়াত এলোমেলো! তারা এক বা একাধিক একত্রে কখনও প্রবলভাবে ঢুঁ মেরে পৃথিবির মুন্ড ঘুরিয়ে দিয়েছে! আর তাতেই ত’ পৃথিবী একদিকে হেলে গেছে! আমাদের পরিচিত চাঁদও নাকি এরকম ঢুঁ খাওয়া কতকগুলি বিশাল বিশাল প্রস্তরখন্ড একত্রিত হয়ে তৈরী হয়েছে!
আচ্ছা, যদি এমন কান্ড না হত, তাহলে পৃথিবির অক্ষ তার কক্ষতলের ওপর সোজা খাড়া অর্থাৎ লম্ব থাকত ( বা হেলে না থাকত ), তাহলে ঋতু পরিবর্তনের জন্য যা যা হয়েছে তার কিছুই হত না। কোথায় আমরা, কোথায় কি !
কিন্তু ওসব ভেবে ত লাভ নেই। পৃথিবিও হেলে আছে আর আমরাও আছি। সুতরাং তার ফলাফল দেখা যাক। ফলাফলটা এরকম–দোর্দন্ডপ্রতাপ সূর্যদেবকেও পৃথিবির ওপর আলো ফেলতে গেলে বেশী ট্যাঁ-ফোঁ না করে একটা সীমা রেখার মধ্যে চলাফেরা করতে হয়! সীমা হল উত্তর দিকে কর্কটক্রান্তি আর দক্ষিণ দিকে মকরক্রান্তি রেখা। উত্তর দিকে যখন আসে তখন সেখানে গ্রীষ্মকাল, দক্ষিণে শীতকাল। আর যখন সে দক্ষিণে যায়, সেখানে গ্রীষ্মকাল আর উত্তরে শীতকাল।
গ্রীষ্মকালে উত্তর মেরু ও তার কাছাকাছি অঞ্চল দীর্ঘকাল, অর্থাৎ প্রায় ছয় মাসকাল, এক নাগাড়ে সূর্যের আলো দেখতে পেলেও দক্ষিণ মেরু অঞ্চল অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকে! অবশ্য ‘দীর্ঘকাল’ মানে একেবারে ছয়মাস নয়। ছয় মাস ধরে অল্প অল্প করে আলো বাড়তে বাড়তে মাসতিনেকের জন্য উত্তর মেরু পুরো আলোকিত হয়, তার পর আবার দিন কমতে থাকে আর রাতের দৈর্ঘ বাড়তে থাকে, এবং শেষ পর্যন্ত উত্তর মেরু পুরো অন্ধকারে যাবার জন্য তৈরী হতে থাকে। এই সময় দক্ষিণ মেরুতে ঠিক বিপরীত ঘটনা ঘটে। সঠিকভাবে বলতে গেলে উত্তর মেরুতে দিনে ২৪ ঘন্টাই দিন থাকে ১১ সপ্তাহের মত। তার আগে হয়ত ২৩ ঘন্টা দিন একঘন্টা রাত বা ২২ ঘন্টা দিন ২ ঘন্টা রাত– এমনি হয়।
এই বার আমাদের নরওয়ের কথা বলতে পারি। এইদেশ এবং আরও ক’টি দেশ যেমন আলাস্কা ইত্যাদি উত্তর মেরুপ্রদেশের খুব কাছা কাছি। তাই অল্পসল্প এদিক-ওদিক হলেও, মেরুর যা চরিত্র এসব দেশেরও প্রায় তাই-ই। এখন হয়েছে কি, সেই ১৯০৭ সালে নরওয়ে দেশের মধ্যবর্তী এক পাহাড়ী অঞ্চলে একটি শিল্পাঞ্চল গড়ে ওঠে, যা আবার ছোট মালভূমির মধ্যেকার জায়গা! পাহাড়ের আড়ালে থাকায় গ্রীষ্মকালেই এখানে সূর্যের আলো আসে না, আর শীতকালে সূর্য যখন দক্ষিণ গোলার্ধে তখনও যে আসবে না, তা বলাই বাহুল্য।
একেবারে মেরু অঞ্চলের কাছাকাছি হওয়ায় সেখানে প্রবল ঠান্ডা। যখন উত্তর মেরুতে গ্রীষ্মকাল, তখন মাস ছয়েক রোদ পাবার কথা, কিন্তু পাহাড়ের মধ্যবর্তী উপত্যকায় হওয়ায় সর্বদাই ছায়াময়! আর শীতকালে ? তখন ত’ মাসছয়েকের জন্য প্রবল ঠান্ডার সঙ্গে ঘোরতর অন্ধকার! শহরের স্থপতি তখন থেকেই মতলব ভেঁজেছিলেন কৃত্রিম উপায়ে সূর্যের আলো আনার। তবে তখন ত’ বিজ্ঞানের এত উন্নতি হয় নি! তাই বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে শহরের পাশের পাহাড়ে যাবার জন্য রোপওয়ে তৈরী হয়েছিল যাতে শহরবাসী একটু আলো আর উষ্ণতার স্বাদ পেতে পারে! এমনকি শীতকালেও! তাতেই ত গত ১০০ বছরেরও বেশী হলেও ঐ শহরের মানুষ রোদই দেখেনি! দড়িপথে পাহাড়ে গিয়ে রোদ উপভোগ করেছে!
এতদিনে এবার সেপ্টেম্বর মাস থেকে ঐ এলাকার বাসিন্দারা শহরের কেন্দ্রে থাকা টাউন হলের সামনের চত্বরে সূর্যের আলো পাবেন, একেবারে শীতকালের শুরু থেকেই! তা আসবে কোথা থেকে ? পাহাড়ের পার্শ্ববর্তী এলাকায় তিনখানা ৪৫০ মিটার উঁচু স্তম্ভ তৈরী করে তার মাথায় তিনখানা বিশাল বিশাল আয়না লাগানো হয়েছে (তিনটি স্তম্ভের ওপর একখানা বিশাল আয়নাও হতে পারে, এব্যাপারে বিশদ কিছু জানানো হয় নি )। এর থেকে প্রতিফলিত আলো টাউনহলের সামনে এসে পড়বে! খরচ কত বলুন দেখি ? ৮,২৩,০০০ ডলার!
এতদিন নরওয়ে সরকার দিনে ২৪ ঘন্টাই দিন দেখাবার জন্য পর্যটকদের আমন্ত্রণ জানাতেন, এবার থেকে রাতেও দিনের আলো দেখতে তাঁদেরকে ডাকবেন! খরচটা উঠে আসবে! কি বলেন ?
* * * * *