কেমন মানুষ আমরা?

অনেকদিন ধরে একটা মজার পোস্ট দেব ভেবে রেখেছিলাম। কিন্তু আজকে সকালে এমন একটা খবর দেখলাম, যে সেটা লেখার ইচ্ছা আপাততঃ নেই। গতকাল মহাজাতি সদনের কাছে একটি ল্যাম্প-পোস্টে এক ভদ্রমহিলা দিনে দুপুরে গলায় ফাঁস লাগিয়ে ঝুলে আত্মহত্যা করলেন। বিকের চারটে নাগাদ। কিন্তু কেউ এসে তাকে থামাল না। কেউ খেয়াল ও করেনি। নাকি করেছিল? কলকাতার নতুন ত্রিফলা ল্যাম্প-পোস্টগুলি তো এমন উঁচু নয় যে, একবার ওপরে উঠে গেলে কারোর নজরে পড়বে না! তাহলে? মহিলা নাকি ফুটপাথেই থাকতেন। স্বামীর নেশার সমস্যায় বিরক্ত হয়ে এই সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু যখন ঘটনা ঘটছিল, কেউ দেখেনি? ভাবতে কিরকম অবাক লাগে না? সত্যি বলতে গেলে, ভাবতে অস্বস্তি হয়। আমি যদি একলা থাকি, আর রাস্তায় বেরিয়ে কিছু দুর্ঘটনা হয়, তাহলে লোকজন তো মনে হয় না তাকিয়ে চলে যাবে অথবা হাঁ করে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকবে, কিন্তু কিছু করবে না।

কেন আমরা এরকম হয়ে গেছি?

আমার মনে হয় এর একটা বড় কারণ আমাদের আইনি ব্যবস্থার জটিলতা। যে খবর মাঝে মাঝেই শোনা যায়, হাওড়া স্টেশনের কাছে রেল লাইনে মৃতদেহ পড়ে থাকলে তা হাওড়া পুলিশ, না কলকাতা পুলিশ, না রেল পুলিশ- কার আওতায় পড়ে, সেই হিসাব করতেই দিন কাবার। কিঞ্ছুদিন আগে আমার এক বন্ধু দূরপাল্লার বাসে কলকাতার বাইরে যাচ্ছিলেন। বিদ্যাসাগর সেতুতে যখন বাস, তখন সেখানে একটা ছোট অ্যাক্সিডেন্ট গোছের ঘটে। যে গাড়িটি ঘটিয়েছিল, সেটি সেতুর টোল প্লাজা পেরিয়ে চলে যায়, কিন্তু আবার কলকাতার দিকে ফিরে আসে। পুরো ঘটনাটা আমার ঠিক মনে নেই। তবে সেখানে যে ঝামেলাটা হয়েছিল সেটা এইরকম- গাড়ি কলকাতার দিক থেকে টোল প্লাজা পেরিয়ে গিয়ে আবার ফিরে এসেছিল। তাই এবার তার কেস কলকাতা পুলিশ, না হাওড়া পুলিশ নাকি টোল প্লাজা পরিচালনকারি সংস্থা, কাদের এক্তিয়ারে, সেই ধাঁধা মেটানোর চক্করে সাধারণ মানুষের অশেষ দুর্ভোগ।

হাসপাতালে দুর্ঘটনাগ্রস্ত রোগীদের নিয়ে গেলে আগেই থানায় ডায়েরি ইত্যাদি নিয়ে বাজে ঝামেলা করা হয়। এই সমস্যা মেটানোর জন্য আগেই থেকেই কেন প্রতিটা বড়, নিদেন পক্ষে সরকারি হাসপাতালে একটা করে মিনি পুলিশ বুথ রাখা হয়না? যাতে সেখানে নিয়ে গেলেই ঝটাঝট ডায়েরি হয়ে যায়? পুলিশের কাজ সাহায্য করা। কোন থানা, রাস্তার এপার না ওপার, এই সব বিষয়গুলি কি একটা মানুষের প্রাণের থেকে বেশি জরুরী?

আমি নিশ্চিত, গতকাল যদি কেউ ওই মহিলাকে গলায় ফাঁস দিতে দেখেও থাকে, সে নিজেকে এই ভেবেই ক্ষান্ত করেছে – ওর ইচ্ছা ও ঝুলছে, আমার তাতে কি? কেন ফালতু থানা পুলিশে জড়িয়ে নিজের দিন বরবাদ করি!! গতকালের ঘটনার দায় আমি পুলিশের ওপরে দিচ্ছি না, কিন্তু সাধারন মানুষের মধ্যে এই একে অপরের প্রতি উদাসীনতা কেন এসেছে, এবং ক্রমশঃ বেড়ে চলেছে, সেটা খতিয়ে দেখার সময় মনে হয় এবার এসেছে। আর কতদিন, কতভাবে, সব দায় ঘাড় থেকে ঝেড়ে ফেলে, শুধু নিজের জন্য বাঁচব আমরা?