বন্ধু দিবস , বন্ধু দড়ি, বন্ধু তালিকা

ভাঁড়ের চা এর লেখার সূত্র ধরে এই পোস্ট।

সালটা ১৯৯৯। আমি একটা প্রতিষ্ঠানে যেতাম মাল্টিমিডিয়া ট্রেনিং নিতে। সেখানে এইরকম আগস্টের এর সকালে, মনোজ, সেখানেই সম্ভবতঃ মার্কেটিং এ কাজ করত, আমারই কাছাকাছি বয়স, হঠাৎ এসে আমাকে বল্ল – আরে তুমনে ফ্রেন্ডশিপ ব্যান্ড নহি পেহনি? আমি অবাক হয়ে বললাম- ওহ কেয়া হ্যায়? তাতে সে আমার দিকে অত্যন্ত করুণার চোখে তাকিয়ে যা বল্ল, তার বঙ্গানুবাদ হল – আমার মত দুর্ভাগা কেউ আর নেই। আমি ফ্রেন্ডশিপ ডে তে ফ্রেন্ডশিপ ব্যান্ড হাতে না পড়ে ঘুরছি !! এ একেবারে আপামর ফ্রেন্ডস দের প্রতি অত্যন্ত অবিচার। এবং এই দিনটা যে ফ্রেণ্ডশিপ ডে সেটাও যে আমি জানি না, তার জন্য আমার নির্ঘাত দ্বীপান্তর হওয়া উচিত।

তারপরে সে আমাকে তার ব্যান্ড দেখাল। দেখলাম, তার হাতে একটি রামধনু স্ট্রাইপ দেওয়া ইল্যাস্টিকের ব্যান্ড। তখন আমার দিশি মাথা আলোকিত হল!! – এই বস্তুটিকে তার আগের বছর বিখ্যাত করেছেন শাহরুখ খান , ‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’ ছবিতে। আর বাজার সেই সূত্রটুকু ধরে নিয়েছে কচি মাথা চিবোনোর জন্য। স্মৃতি বলছে, তার আগে অবধি ভারতে ফ্রেন্ডশিপ ডে এর কোন ধারনা ছিল না। ওটিকে এদেশে আমদানি করেছিলেন স্বর্গত যশ চোপড়াজী।

৯০-৯১তে বিশ্বায়নের পরে পরে এইসব দিন-টিন আমাদের দিনযাপনকে ক্রমশঃই জটিল করে তুলছে। কিছুদিন আগে পরপর গেছে মাদার্স ডে, ফাদার্স ডে। তার পরে আবার দেখলাম একদিন হল পেরেন্টস ডে!! এই তো বাবা-মাকে নিয়ে আলাদা করে একবার আদিখ্যেতা হল, আবার এক সাথে?? ছোটবেলায় তো জানতাম, পেরেন্টস ডে মানে যেদিন স্কুলে বাবা-মা রা সবাই যান, আর আমরা নাচ -গান অনুষ্ঠান করি…

ভ্যালেন্টাইন্‌স্‌ ডে যে কি বস্তু সেটা জানলাম কলেজে এসে। এই দিনে গোলাপ এবং চকোলেট পাওয়া ক্লাসের বন্ধুদের দেখে বুঝলাম, নারী জন্ম বৃথা, যদি একটি দেদার আহলাদ দিতে পারা বালকবন্ধু না থাকে!!

ইদানীং বন্ধু দিবস দিশি ব্যবসায়ের মধ্যে ঢুকে গেছে। রাখী পূর্নিমার আগে-পিছে আসে বলেই, এই সময় থেকেই রাখী ব্যবসায়ীরা বন্ধু-দড়ির ব্যবসা করতে থাকেন। বন্ধু-দড়ি কি, তা যদি না বোঝেন, তাহলে বলি- এটি প্রায় একটি রাখীই- শুধু মাঝখানে ওই বড় কারুকার্য করা চাকতিটা থাকে না। আজকাল স্কুলে পড়া বাচ্চাদের বাবামায়েদের এই এক নতুন খরচা বেড়েছে- সারা ক্লাসের জন্য বন্ধু দড়ির যোগান দিতে না হলেও, অন্তত ডজন খানেক তো দিতেই হয়।

গতকাল আমার বাড়ীর সাহায্যকারিনী মহিলা আমাকে এসে অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানিয়েছে, তার ১৬-১৭ বছরের ছেলে ‘ফ্রেন্ডসি’ না কি দিনে হাতে দশ বারোটা সুতো বেঁধে এসেছে। সেই ছেলে এতদিন বোনেদের কাছে রাখী বাঁধত না। কিন্তু ইদানীং প্রেমে পড়ে তার এহেন পরিবর্তন !!

শেষে একটাই কথাঃ বিশ্বায়নের সাথে ফ্রি বন্ধু দিবস আমদানি করেছিলেন মনমোহন সিং, বন্ধু দড়ির খোঁজ দিয়েছিলেন যশ চোপড়াজী, আর বন্ধুদের যে তালিকাভুক্ত করতে হয়, সেটা আমাদের শিখিয়েছেন মার্ক জুকারবার্গ!!