প্রাচিন মানুষ হওয়ার কারণে, স্কুলে পড়ার সময় পুরোন কলকাতার কিছু কিছু নিদর্শন দেখেছি, যা মিউজিক ওয়ার্ল্ড বা টেলিগ্রামের কথায় মনে পড়ল। সে সব আর দেখা যাবে না!
উত্তর বা পূর্ব কলকাতায় তখন এমন সব দেখা যেত। ( সময়কাল ১৯৫১-১৯৫৮/৫৯, আজকের নিরিখে বেশ প্রাচিনই। তাই ত ?)
স্কুলে পড়বার সময় নারকেলডাঙ্গায় (পূর্ব কলকাতা) থাকতাম। মেন রোডে ছিল মুরারিদা’র দোকান, আর ঐ দোকানের পাশে ছিল একটা গ্যাসের আলোর পোষ্ট। বাড়ি থেকে দেখতাম প্রতিদিন সন্ধ্যায় কাঁধে মই নিয়ে একটা লোক আসত, পোষ্টের গায়ে মই লাগিয়ে উঠে আলোর চৌকো বাক্সের দরজা খুলে, দেশলাই কাঠি দিয়ে আলো জ্বালিয়ে দিত। একদিন কৌতুহল বশে কাছে গিয়ে দেখেছিলাম, কি ভাবে কি করে। একটা নলের শেষপ্রান্তে ম্যান্টেল লাগানো থাকত, আর থাকত দুটো লম্বা ঝোলানো সরু তার, বোধ হয় খোলা-বন্ধ করার জন্য ব্যবহৃত লিভারের দু’প্রান্তে লাগানো– এর একটা টানলে গ্যাস খুলত আর অন্যটা টানলে বন্ধ হয়ে যেত। সে লোকটাই প্রতিদিন সকালে এসে, গ্যাস নেভানোর তারটা টেনে নিভিয়ে যেত।
এই ব্যবস্থায় আলো জ্বলত রাজাবাজার থেকে ফুলবাগান পর্য্যন্ত। উত্তর কলকাতার হরিঘোষ ষ্ট্রীটে ইলেক্ট্রিক আলো থাকলেও গলিঘুঁজিতে গ্যাসের আলো দেখেছি। এই দু’জায়গায় দেখা পাওয়ার’র অর্থ, আরও অনেক স্থানেই দেখা পাওয়ার সম্ভাবনা।
এক সময় কলকাতায় ঘোড়ায় টানা ট্রাম চলত, এটা সবারই জানা। না, সে সব আমি দেখিনি বটে, তবে চলতে চলতে ক্লান্ত ঘোড়া যে মাঝে মাঝে থেমে জলপান করত লোহার তৈরী চৌবাচ্চায় রাখা জল, এটাও সবাই জানে। তেমন চৌবাচ্চা একটা ছিল লোয়ার সারকুলার রোডে (এখন এ পি সি রায় রোড), রাজাবাজারের মোড়ে, সায়েন্স কলেজের উল্টোদিকের ফুটপাথে (রাস্তাতেও হতে পারে)।
বড়রাস্তায় মাঝে মাঝে দেখেছি, ফুটপাতের ওপর, শক্ত-পোক্ত কোমর সমান উঁচু, লোহার থামের মত কিছু পোঁতা। সেটা ফাঁপা ছিল। আর ছিল গোলাকার জানালার মত ব্যবস্থা, যা কাচঢাকা। ভেতরে হাতলের মত কিছু একটা থাকত।
বন্ধুদের জিজ্ঞেস করে জেনেছিলাম যে ওটা ‘ফায়ার অ্যালার্ম’। বিপদের সময় কাচ ভেঙ্গে হাতল ঘুরিয়ে দিলে নাকি ফায়ার ব্রিগেডের অফিসে বিপদ সংকেত পৌঁছে যেত! এটা পরীক্ষা করে দেখা হয়নি! তাই নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছি না।
রাস্তার পাশে হাইড্রেন্ট থেকে জল নিয়ে দু’বেলা রাস্তা ধোয়া, ঠেলা গাড়ি, হাতে টানা রিকশা ( এ’ত এখনো চলে অলিগলিতে) এসবও ছিল।
পুরোন কলকাতার ফেরিওয়ালাদের নানা রকমের হাঁকও শুনেছি, যা এখন বিশেষ শুনতে পাই না। তবে হঠাৎ শুনলে চমকে উঠে সেই ছোট বেলায় চলে যাই। পরে কোন সময় বলার ইচ্ছে রইল এ সম্বন্ধে।